একটি স্বাধীন ও সভ্য দেশে চুরির অভিযোগে তিনজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হবে—এটা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। কালিয়াকৈরের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি আইনহীনতার এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। গরু চুরির অভিযোগে প্রকাশ্য দিবালোকে তিনজনকে হত্যা করা হলো, পিকআপ ভ্যান পুড়িয়ে দেওয়া হলো, আর আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম মধ্যযুগীয় বর্বরতা।
অপরাধ ও সাজার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান,,
চুরি অবশ্যই অপরাধ। কিন্তু চুরির শাস্তি কি মৃত্যু? আমাদের দেশের প্রচলিত আইনে চুরির সুনির্দিষ্ট শাস্তি আছে। কিন্তু যখন জনতা নিজেই বিচারক, জল্লাদ এবং সাক্ষী হয়ে ওঠে, তখন তাকে আর ‘বিচার’ বলা যায় না, তা স্রেফ হ()ত্যাকাণ্ড’ । যারা এই কাজ করেছে, তারা চোরের চেয়ে বড় অপরাধী।
কেন এই বেপরোয়া মব জাস্টিস?
সাধারণ মানুষ কেন আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে? এর দায় সরকার ও প্রশাসন এড়াতে পারে না।
নিরাপত্তাহীনতা: দেশে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি যে হারে বেড়েছে, তাতে সাধারণ মানুষ এখন চরম আতঙ্কিত।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি:** পুলিশি ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থা আজ পাহাড়সম। মানুষ মনে করে, চোর ধরিয়ে দিলেও ঘুষের বিনিময়ে সে ছাড়া পেয়ে যাবে। এই অবিশ্বাসের কারণেই মানুষ নিজের হাতে ‘বিচার’ তুলে নেওয়ার স্পর্ধা দেখাচ্ছে।
বড় চোরদের বেলায় কেন নীরবতা?
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, যারা কয়েকটা গরুর জন্য মানুষ মেরে ফেলছে, তারা কিন্তু হাজার কোটি টাকা পাচার করা ‘সাদা কলারের’ চোরদের সামনে টু শব্দটিও করে না। বড় বড় চোরেরা যখন দেশের সম্পদ লুট করে পাড়ি জমায়, তখন এই উন্মত্ত জনতার বীরত্ব কোথায় থাকে? কেবল দুর্বল ও অসহায় পেলেই কি আমাদের নৈতিকতা এভাবে জেগে ওঠে?
ষড়যন্ত্র নাকি নিছক ক্ষোভ?
কালিয়াকৈরের এই ঘটনার আড়ালে অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা ষড়যন্ত্র আছে কি না, তা দ্রুত তদন্ত করা জরুরি। মব জাস্টিসকে অনেক সময় ব্যক্তিগত শত্রুতা বা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের মোড়ক কি না, তা খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া চরম অপরাধ। যারা আজ চুরির দায়ে মানুষ মারছে, তারা কাল হয়তো সামান্য তুচ্ছ কারণে আপনার বা আমার ওপর চড়াও হবে। রাষ্ট্র যদি দ্রুত এই মব জাস্টিস বন্ধ না করে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেয়, তবে অচিরেই এই দেশ একটি শ্মশানে পরিণত হবে।
বিচারহীনতার এই ভাইরাস বন্ধ হোক। খুনিদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হোক।
Views: 98
Related