নেত্রকোনার পূর্বধলার ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বাঁধা এক ভয়াবহ ক্যান্সারের বহিঃপ্রকাশ। যে বাবা সন্তানের জন্য বটবৃক্ষের ছায়া হওয়ার কথা, সেই যখন লালসার আগুনে নিজের সন্তানকে দগ্ধ করে, তখন বুঝতে হবে সমাজের নৈতিকতার দেয়ালগুলো ধসে পড়ার আর কিছু বাকি নেই। ১৫ বছরের কিশোরী, যে এখনো পৃথিবীর জটিলতা বুঝে ওঠার আগেই নিজের জন্মদাতার হাতে লালসার শিকার হয়ে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা—এই দায় কেবল ওই পশু রূপী বাবার নয়, এই দায় পুরো সমাজের।
কেন আজ রক্তই রক্তের তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠছে? কেন নিজের ঘরেই আজ নারীরা অনিরাপদ? এর কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি তিক্ত সত্য সামনে আসে:
আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব:** আমাদের দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ। অপরাধীরা জানে যে, ফাঁকফোকর গলে বের হয়ে আসা সম্ভব। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও তার দ্রুত কার্যকরের অভাব অপরাধীদের মনে ভয়ের বদলে দুঃসাহস তৈরি করছে।
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অনুপস্থিতি:** ধর্ম কেবল আচার-সর্বস্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্মের মূল বাণী—পরস্পরের প্রতি সম্মান, সংযম এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা আজ নেই বললেই চলে। পরিবারের ভেতর থেকে যে নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা আজ ঠুনকো আভিজাত্য আর যান্ত্রিকতার চাপে পিষ্ট।
পারিবারিক কাঠামোর ভাঙন:** প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে মানবিক সম্পর্কের পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে। পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং বিকৃত রুচির প্রসারে মানুষ নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে।
নিরবতা বনাম সাহসিকতা: ঘটনা কি আগের চেয়ে বেড়েছে?
অনেকেই প্রশ্ন করেন, সমাজ কি এখন আগের চেয়ে বেশি খারাপ হয়েছে, নাকি এগুলো এখন প্রকাশ পাচ্ছে? সত্যটা হচ্ছে—দুটোই। একসময় লোকলজ্জা আর কলঙ্কের ভয়ে নারীরা নিজের আপনজনদের হাতে নির্যাতিত হয়েও মুখ খুলতেন না। কিন্তু বর্তমানের নারীরা অনেক বেশি সচেতন এবং সাহসী। তারা এখন নির্যাতনের অন্ধকার কুঠুরি থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিবাদ করতে শিখছেন। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো, সামাজিক অস্থিরতা এবং বিকৃত মানসিকতার মানুষের সংখ্যাও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। আগে যেখানে মানুষ অন্তত ‘রক্তের সম্পর্ক’কে সমীহ করত, এখন সেই শেষ আশ্রয়টুকুও হায়েনার থাবায় বিপন্ন।
কী বিচার হওয়া উচিত এই অমানুষদের?
যারা পবিত্র সম্পর্কের অমর্যাদা করে নিজের সন্তান বা বোনকে লালসার শিকার বানায়, তাদের জন্য প্রচলিত কোনো সাধারণ সাজাই যথেষ্ট নয়। এদের বিচার হতে হবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে। তাদের এমন শাস্তি হওয়া উচিত যা দেখে অন্য কোনো সম্ভাব্য অপরাধীর বুক কেঁপে ওঠে। কেবল জেল-হাজত নয়, এদের সামাজিকভাবে বয়কট করা এবং আইনের সর্বোচ্চ কঠোরতা প্রয়োগ করা সময়ের দাবি।
সভ্যতা মানে কেবল উঁচু দালান বা আধুনিক প্রযুক্তি নয়; সভ্যতা হলো অন্যের অধিকার এবং সম্মানের নিরাপত্তা দেওয়া। আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত সভ্য হতে পারব না, যতক্ষণ না প্রতিটি ঘরে নারী ও শিশুরা নিঃশঙ্কচিত্তে ঘুমাতে পারবে। আমাদের ফিরে যেতে হবে মানবিকতার গোড়ায়। প্রতিটি পরিবারে শুদ্ধ চর্চা শুরু করতে হবে।
নেত্রকোনার এই ঘটনা আমাদের গালে এক বড় চড়। এখন সময় এসেছে আয়নায় নিজেদের মুখ দেখার। আমরা কি কেবল জৈবিক চাহিদাসম্পন্ন প্রাণী হিসেবে বেঁচে থাকব, নাকি সত্যিকার অর্থে ‘মানুষ’ হয়ে উঠব? যদি আজ আমরা সরব না হই, তবে এই হায়েনার থাবা একদিন আপনার-আমার দরজাতেও কড়া নাড়বে।
শাস্তি হোক ওই পশুর, মুক্তি পাক অবরুদ্ধ শৈশব। সমাজের এই অন্ধকার কাটাতে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রতিরোধ এবং কঠিন বিচার। আমরা কি প্রস্তুত?
Views: 194
Related